রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যুক্তরাষ্ট্রকে একটি প্রস্তাব দিয়েছেন। পুতিনের প্রস্তাবটি হলো, ভবিষ্যতে একটি অর্থনৈতিক চুক্তির আওতায় রাশিয়ার বিরল খনিজ (ধাতু) অনুসন্ধান-উন্নয়নে মস্কো ও ওয়াশিংটন যৌথভাবে কাজ করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রকে প্রস্তাবটি দেওয়ার সময় রুশ প্রেসিডেন্ট দাবি করেন, প্রতিবেশী যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের চেয়ে তাঁর দেশে বিরল খনিজ সম্পদের মজুত অনেক বেশি আছে।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ শুরু করে রাশিয়া। এই যুদ্ধ এখনো চলছে। জো বাইডেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট থাকাকালে তিনি এই যুদ্ধে ইউক্রেনকে সামরিক-আর্থিকসহ নানাভাবে ব্যাপক সাহায্য-সহযোগিতা করেন।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন (বাঁয়ে) ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পফাইল ছবি: রয়টার্স
কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিয়ে তাঁর দেশের ইউক্রেন-নীতিতে নাটকীয় বদল এনেছেন। তিনি এই যুদ্ধ বন্ধে উদ্যোগী হয়েছেন। এ জন্য ইউক্রেনকে বাইরে রেখেই তিনি রাশিয়ার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা শুরু করে দিয়েছেন।
একই সঙ্গে ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুদ্ধে ইউক্রেনকে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি ডলারের সহায়তা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এখন এই অর্থ তিনি ফেরত চান। ট্রাম্প এখন ইউক্রেনের সঙ্গে খনিজ চুক্তি করার পথে রয়েছেন। চুক্তিটি হলে ইউক্রেনের বিরল খনিজ সম্পদে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হবে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি আগামীকাল শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাবেন। তাঁর এই সফরে চুক্তিটি সই হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের মধ্যে খনিজ চুক্তির খসড়া নিয়ে আলাপ-আলোচনার মধ্যেই পুতিন তাঁর প্রস্তাবটি ওয়াশিংটনকে দেন।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি (বাঁয়ে) ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পফাইল ছবি : রয়টার্স
ট্রাম্প বলেছেন, রাশিয়ার ভূখণ্ডে থাকা খনিজও তিনি কিনতে চান। রাশিয়ায় কাছে খুব ভালো বিরল খনিজ আছে। ইউক্রেনের কাছেও তা আছে।
ট্রাম্প বলেছেন, খনিজ নিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তি হলে মস্কো ও ওয়াশিংটন উভয়ে লাভবান হবে। উভয়ের ভালো হবে।
বিরল খনিজের বৈশ্বিক উৎপাদন-সরবরাহের ৯৫ শতাংশেরই নিয়ন্ত্রণ চীনের হাতে। এই খনিজ প্রতিরক্ষা, ভোক্তা ইলেকট্রনিকসের মতো শিল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত। ফলে অন্যান্য দেশ এই খনিজের নিজস্ব অনুসন্ধান-উৎপাদন-সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টায় আছে।
রাশিয়ার কাছে কতটা বিরল খনিজ আছে, দেশটিতে এই শিল্পের অবস্থা কী, তা খতিয়ে দেখেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
রাশিয়ার মজুত
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) তথ্য অনুসারে, বিরল খনিজের মজুতে চীনের অবস্থান সবার ওপরে। এরপরের অবস্থানে ক্রমানুসারে আছে ব্রাজিল, ভারত ও অস্ট্রেলিয়া। এই খনিজের মজুতের দিক থেকে বিশ্বে রাশিয়ায় অবস্থান পঞ্চম।
ইউএসজিএসের অনুমিত হিসাব বলছে, রাশিয়ার মোট মজুতের পরিমাণ ৩ দশমিক ৮ মিলিয়ন মেট্রিক টন।
নিজেদের সামগ্রিক মজুত নিয়ে রাশিয়ার অনুমিত হিসাব অবশ্য উল্লিখিত পরিমাণের চেয়ে অনেক বেশি।
রাশিয়ার প্রাকৃতিক সম্পদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হিসাবমতে, ২০২৩ সালের ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশটির বিরল খনিজের মোট মজুত ২৮ দশমিক ৭ মিলিয়ন টন। এর মধ্যে ৩ দশমিক ৮ মিলিয়ন টন উন্নয়নাধীন বা উন্নয়নের জন্য প্রস্তুত অবস্থায় আছে।
বিরল খনিজ মজুতের বৈশ্বিক চিত্রছবি: রয়টার্স
রাশিয়ার খনিজ শিল্পের বিকাশ-উন্নয়ন নিয়ে দেশটির সরকারি নথি বলছে, এই খনিজের অভ্যন্তরীণ চাহিদা কম। একই সঙ্গে এই শিল্পের ক্ষেত্রে চীনের দিক থেকে রাশিয়া তীব্র প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হচ্ছে। এ বিষয়গুলো রাশিয়ায় এই শিল্পের বিকাশের ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
রাশিয়ার এই খাতসংক্রান্ত উন্নয়নকৌশলের তথ্য অনুসারে, দেশটি ২০৩০ সালের মধ্যে বিরল খনিজ উৎপাদনকারী বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ দেশের একটি হওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে। এই সময়ে তারা বৈশ্বিক বাজারের ১২ শতাংশ খনিজ উৎপাদন করতে চায়।
রাশিয়ার উৎপাদন
রাশিয়ায় বিরল খনিজের একমাত্র উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সোলিকামস্ক ম্যাগনেশিয়াম প্ল্যান্ট। ২০২২ সালে সাবেক মালিকদের কাছ থেকে প্ল্যান্টটি নিয়ে নেয় রুশ সরকার। ২০২৩ সালে রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান রোসাটমের কাছে এটিকে হস্তান্তর করা হয়।
রোসাটম পারমাণবিক শক্তি নিয়ে কাজ করে। তবে প্রতিষ্ঠানটি রাশিয়ার অন্যান্য উচ্চ প্রযুক্তির খাতেও বৈচিত্র্য আনতে ভূমিকা রাখছে। একটি বিশেষ জাতীয় প্রকল্পের আওতায় বিরল খনিজের উন্নয়নে কাজ করছে রোসাটম।
উত্তর রাশিয়ার মুরমানস্ক অঞ্চলের রোসাটম-নিয়ন্ত্রিত মজুত থেকে বিরল খনিজসমৃদ্ধ জমাটবাঁধা উপকরণের সরবরাহ আসে সোলিকামস্ক প্ল্যান্টে। রাশিয়ার একমাত্র এ স্থান থেকেই সক্রিয়ভাবে বিরল খনিজ উত্তোলন করা হয়।
প্ল্যান্টটি বর্তমানে প্রতিবছর প্রায় চার হাজার টন জমাটবাঁধা উপকরণ প্রক্রিয়াকরণ করছে। আর রাশিয়ার বিরল খনিজের বর্তমান উৎপাদন বৈশ্বিক উৎপাদনের মাত্র ১ শতাংশ। পরিমাণের হিসাবে তা প্রায় ২ হাজার ৬০০ টন।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনছবি: রয়টার্স
রাশিয়ার পরিকল্পনা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দিন কয়েক আগে ঘোষণা দেন, রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক উন্নয়ন বিনিময় কার্যকর হবে ২৪ ফেব্রুয়ারি।
ট্রাম্পের এই ঘোষণার দুই ঘণ্টার কম সময়ের মধ্যে পুতিন বিরল খনিজ নিয়ে একটি বৈঠক করেন। তিনি বলেন, এটি রাশিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য একটি অগ্রাধিকারমূলক খাত।
গত সপ্তাহে পুতিনের দীর্ঘদিনের বন্ধু বিজ্ঞানী মিখাইল কোভালচুক একটি সম্মেলনের আয়োজন করেছিলেন। এই বিজ্ঞানী রাশিয়ার শীর্ষস্থানীয় একটি গবেষণাকেন্দ্র কুরচাটভ ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্টও। সম্মেলনে বিরল খনিজসহ অন্যান্য খনিজ নিয়ে কথা বলেন পুতিন।
পুতিন তাঁর বক্তৃতায় সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিরল খনিজ অনুসন্ধান, উত্তোলন ও তা ব্যবহারে দক্ষতা হারানোর জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি কুরচাটভ ইনস্টিটিউট ও রোসাটমকে এই হারানও গৌরব পুনরুদ্ধারের দিকে মনোনিবেশ করার জন্য আহ্বান জানান।
রাশিয়ার বিরল খনিজের সবচেয়ে বড় মজুতকেন্দ্র টমটর। গত নভেম্বরে পুতিন টমটরের অপারেটরের বিরুদ্ধে উষ্মা প্রকাশ করেন। অপারেটরের বিরুদ্ধে এই মজুতের উন্নয়ন-বিকাশ বিলম্বিত করার অভিযোগ তোলেন তিনি। একই সঙ্গে পুতিন এই খাতের উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে পরামর্শ দেন। দরকারে তৃতীয় পক্ষের সাহায্য নিতে বলেন।