নিজের প্রথম মেয়াদে জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে তুমুল বিরোধে জড়িয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এবার সে পথে হাঁটেননি। দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করার পরপরই পাকাপাকি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন।
আর তাতেই গত শুক্রবার পেন্টাগনের ওপর দিয়ে রীতিমতো বরখাস্তের ঝড় বয়ে গেছে।
ওই দিন রাতে ট্রাম্প মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা জেনারেল চার্লস ‘কিউ’ ব্রাউন জুনিয়রকে বরখাস্ত করেন। প্রেসিডেন্টের নির্দেশে সেদিনই সংস্থার আরও ৫ হাজার ৪০০ কর্মীকে ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
এর আগের কয়েক সপ্তাহে পেন্টাগনে যে অস্থিরতা চলছিল, ট্রাম্প এ গণছাঁটাইয়ের মাধ্যমে হয়তো এক রাতেই তা শান্ত করে প্রতিরক্ষা দপ্তরের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
সেদিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর প্রধান কর্মকর্তা অ্যাডমিরাল লিসা ফ্রানচেত্তিকেও চাকরিচ্যুত করা হয়। ট্রাম্পের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও বলেছিলেন, তিনি বিমানবাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী ও নৌবাহিনীর শীর্ষ পদে পরিবর্তনের জন্য প্রার্থী খুঁজছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান পরিচালনার অনুমতি পেতে এ তিনজনের সই প্রয়োজন হয়।
পেন্টাগনের ওই কর্মকর্তাদের কেউই এ কারণে বরখাস্ত হননি যে যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁরা দক্ষতার প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হয়েছেন বা তাঁরা অবাধ্য। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীতে বৈচিত্র্য, সমতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসূচিতে (ডিইআই) জেনারেল ব্রাউনের অতিরিক্ত মনোযোগের কথা আলাদা। হেগসেথ গত বছর প্রকাশিত তাঁর একটি বইয়ে বলেছেন, জেনারেল ব্রাউন ডিইআইয়ের প্রতি অতিরিক্ত মনোযোগী।
ট্রাম্প (নিজের পছন্দের ব্যক্তিদের দিয়ে) পেন্টাগন ঢেলে সাজাতে চাইছেন। এ কারণে সেটির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টই পেন্টাগনের কমান্ডার ইন চিফ, তাই পদাধিকারবলে তাঁর সেই ক্ষমতা রয়েছে।
তবে জেনারেল ব্রাউন ও অ্যাডমিরাল ফ্রানচেত্তিকে চাকরিচ্যুত করা এ ইঙ্গিতই দিচ্ছে যে ট্রাম্পের কাছে গুরুত্বপূর্ণ এসব পদে থাকার মূল যোগ্যতা তাঁর প্রতি প্রশ্নাতীত আনুগত্য। অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রেসিডেন্টের অবস্থান নিরপেক্ষ রাখতে তাঁরা কতটা ভালো পরামর্শ দিতে পারেন, সেটি পরে বিবেচ্য। অথচ প্রেসিডেন্টের শীর্ষ সামরিক উপদেষ্টা হিসেবে তাঁদের মূল কাজ হওয়ার কথা এটাই।
প্রথমবার ক্ষমতায় আসার পর ট্রাম্প দ্রুত নিজের চারপাশে জ্যেষ্ঠ জেনারেলদের ভিড় জমিয়ে ফেলেছিলেন। সেবার চার তারকাবিশিষ্ট অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল জন কেলি ছিলেন ট্রাম্পের দ্বিতীয় চিফ অব স্টাফস।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর প্রতি ট্রাম্পের আগ্রহ অবশ্য নতুন নয়। শৈশব থেকেই তিনি সামরিক বাহিনীর প্রতি আসক্ত। তিনি নিউইয়র্কে সামরিক কায়দার একটি আবাসিক স্কুলে পড়াশোনা করেছেন। তাঁর পছন্দের ব্যক্তিদের একজন জেনারেল জর্জ প্যাটন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে যুদ্ধক্ষেত্রে দারুণ আক্রমণাত্মক ছিলেন সাবেক এই মার্কিন কমান্ডার।
২০১৭ সালের জানুয়ারিতে শপথ গ্রহণের পর আরেক চার তারকাবিশিষ্ট অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল জেমস ম্যাটিসকে নিজের প্রথম প্রতিরক্ষামন্ত্রী করেছিলেন ট্রাম্প। তাঁর প্রশাসনের উচ্চপদে আরও বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তা দেখা গিয়েছিল।
কিন্তু জেনারেলদের সঙ্গে ট্রাম্পের গভীর আস্থার সম্পর্ক একসময় তিক্ততার দিকে চলে যায়। কারণ, প্রশাসনে থাকাকালে কেলি, ম্যাটিস বা ম্যাকমাস্টার (সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল) প্রত্যেকে কোনো না কোনোভাবে ট্রাম্পের ইচ্ছা অনুযায়ী চলেননি।
ট্রাম্পের সঙ্গে ম্যাকমাস্টারের বিরোধ হয় আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করা নিয়ে। ম্যাকমাস্টার আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার না করার পক্ষে ছিলেন। এমনকি তিনি দেশটিতে মার্কিন সেনা উপস্থিতি বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন ট্রাম্পকে।
জেনারেল চার্লস কিউ ব্রাউন জুনিয়র আফ্রিকান বংশোদ্ভূত দ্বিতীয় মার্কিন নাগরিক, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফ অব স্টাফের চেয়ারম্যান পদে নিযুক্ত হয়েছিলেনফাইল ছবি: রয়টার্স
কিন্তু ট্রাম্প অনেক দিন ধরেই আফগানিস্তান থেকে সরে আসতে চাইছিলেন। তাই ম্যাকমাস্টারকেই পদ থেকে সরিয়ে দেন তিনি। ম্যাকমাস্টার এক বছরের সামান্য বেশি ট্রাম্প প্রশাসনে ছিলেন। তাঁকে বরখাস্ত করার পর ট্রাম্প তাঁর প্রশাসনকে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে নেওয়ার ব্যাপারে তালেবানের সঙ্গে আলোচনা শুরুর নির্দেশ দেন।
ম্যাটিসের বেলায় ২০১৭ সালে ট্রাম্প যখন পরমাণু শক্তিধর দেশ উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং–উনের সঙ্গে কথার লড়াইয়ে জড়িয়েছিলেন, তখন তৎকালীন এই প্রতিরক্ষামন্ত্রীর (ম্যাটিস) ভয় ছিল, ট্রাম্প না তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাধিয়ে বসেন। এ জন্য ম্যাটিস উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক ব্যবস্থা কী হতে পারে, সে পরামর্শ দিতে ‘ধীরগতিতে’ অগ্রসর হন। ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাত নিয়েও তিনি সামরিক বিকল্পগুলো কী হতে পারে, তা জানাতে দেরি করেছিলেন তিনি।
ম্যাটিসের ওপর ট্রাম্পের আস্থায় চূড়ান্ত ফাটল ধরে সিরিয়ায় আইএসআইএসের সঙ্গে লড়াই নিয়ে। ম্যাটিস বিশ্বাস করতেন, আইএসআইএসকে পরাজিত করার পরও মার্কিন সেনাদের প্রত্যাহার না করে সিরিয়ায় রেখে দেওয়া উচিত হবে; যাতে আইএসআইএস পুনরায় সংগঠিত হয়ে ফিরে আসার সুযোগ না পায়।
ম্যাটিসের এ–ও মনে হয়েছিল, যদি সিরিয়া থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করা হয়, তবে সেখানে যুদ্ধক্ষেত্রে মিত্রগোষ্ঠী ‘সিরিয়ান কুর্দিস ফোর্স’–কে একা ফেলে রেখে আসা হবে।
সিরিয়ায় আইএসআইএসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করেছিল এ কুর্দি বাহিনী। প্রতিবেশী তুরস্কের শক্তিশালী সামরিক বাহিনীও সিরিয়ার কুর্দি বাহিনীকে আক্রমণ করে বসতে পারে—ম্যাটিসের ছিল সে আশঙ্কাও। কুর্দি বাহিনীকে সন্ত্রাসী সংগঠন মনে করে তুরস্ক সরকার।
২০১৮ সালের ১৯ ডিসেম্বর ট্রাম্প টুইটারে (বর্তমান নাম এক্স) এক পোস্টে সিরিয়া থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করার আদেশ দেওয়ার কথা জানান।
এর পরের কয়েক দিন ম্যাটিস ওভাল অফিসে গিয়ে ট্রাম্পকে তাঁর ওই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার বিষয়ে রাজি করানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু ট্রাম্প রাজি না হওয়ায় পদত্যাগ করেন ম্যাটিস।
কেলি ছিলেন ট্রাম্পের চিফ অব স্টাফ। হোয়াইট হাউসে দায়িত্ব পালনের দিনগুলোয় তিনি প্রেসিডেন্টের নানা সিদ্ধান্তে নিজের দায়িত্ব থেকে অভিমত দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, যেমন আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার বা ন্যাটো থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণের বেলায়।
অ্যাডমিরাল লিসা ফ্রানচেত্তিফাইল ছবি: এএফপি
ট্রাম্প অন্যের মতামত বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে ‘ঘৃণা করতেন’। তাই কেলির সঙ্গে দ্রুতই ট্রাম্পের সম্পর্কের অবনতি হয়। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে কেলি হোয়াইট হাউস ছেড়ে বেরিয়ে যান।
ম্যাটিস পদত্যাগ করার পর ট্রাম্পকে নিয়ে খুব কম বাক্যই ব্যয় করেছেন। তবে সম্প্রতি তিনি একটি বেপরোয়া বিবৃতি দিয়েছেন। বলেছেন, ‘আমার জীবনে দেখা প্রথম প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের জনগণকে এক করার চেষ্টা করেন না, এমনকি চেষ্টা করার ভানও করেন না; বরং তিনি আমাদের বিভক্ত করার চেষ্টায় আছেন।’
আগেরবার পেন্টাগনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে লড়াইয়ের ক্ষত থেকেই হয়তো ট্রাম্প এবার প্রতিরক্ষা দপ্তরের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিতে এতটা উদ্যোগী হয়েছেন।
ট্রাম্প যে এটা করতে চলেছেন, তার ইঙ্গিত তিনি প্রথম মেয়াদের শেষ কয়েক মাসেই দিয়েছিলেন। সেবার ট্রাম্প তাঁর একান্ত অনুগত ক্যাশ প্যাটেলকে পেন্টাগনে একটি প্রভাবশালী পদে বহাল করেন। এবার তাঁকে এফবিআইয়ের পরিচালক করেছেন। সম্প্রতি সিনেট ভোটে এর অনুমোদনও পাওয়া গেছে।
ট্রাম্প তাঁর প্রশাসনে উচ্চপদে থাকা কর্মকর্তা ও পেন্টাগনের শীর্ষস্থানীয়দের কাছ থেকে প্যাটেলের সমপর্যায়ের আনুগত্যই প্রত্যাশা করেন। শুক্রবার রাতের ছাঁটাইঝড়ে ছয় জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তার ঝরে পড়া হয়তো এ প্রত্যাশা পূরণের সূচনামাত্র। হেগসেথকে আগামী দিনগুলোয় তাঁর দপ্তরের লাখো কোটি ডলারের ব্যয় কমানোর উপায়ও খুঁজতে হবে। তাই তিনি খুব সম্ভবত তাঁর কর্মী বাহিনীর একটি বড় অংশকে হারাতে চলেছেন।