প্রায় আট বছর আগে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা রাজধানীর সাতটি বড় সরকারি কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হলেও সমস্যাগুলো কাটেনি; বরং নতুন নতুন সমস্যা সামনে আসছে। শিক্ষাবিষয়ক সমস্যাগুলোর পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কিছু কিছু ‘অবহেলা’র কারণে এখন ‘ইগো প্রবলেমও’ বড় হয়েছে। এ অবস্থায় এসব কলেজের শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন থেকে বের হয়ে তাঁদের জন্য স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় করার দাবি করছেন। তবে তাঁরা স্পষ্ট করে বলছেন, কোনোভাবেই আগের মতো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে তাঁরা যাবেন না।
আজ সোমবার সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সাত কলেজের একাডেমিক ও প্রশাসনিক সম্পর্কের চূড়ান্ত অবসান ঘটিয়ে শিক্ষার্থীদের দাবি অনুযায়ী স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপরেখা প্রণয়ন করতে হবে। কবে বিশ্ববিদ্যালয় হবে, সেই ঘোষণা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দিতে হবে।
এদিকে এই সাত কলেজের জন্য আলাদা বিশ্ববিদ্যালয় বা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান করার বিষয়টি নিয়ে সরকারও ভাবছে। গতকাল রোববার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে। এই সাত কলেজের জন্য আলাদা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান করার বিষয়ে ইতিমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এ নিয়ে কলেজগুলোর শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে বৈঠক করেছে।
জানতে চাইলে ইউজিসির এক উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেছেন, তাঁরা বিভিন্ন ‘মডেল’ নিয়ে কাজ করছেন। এখনো ‘মডেল’ চূড়ান্ত হয়নি।
সাত কলেজের জন্য আলাদা বিশ্ববিদ্যালয় বা উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করার বিষয়টি নিয়ে সরকারও ভাবছে। সাত কলেজের জন্য আলাদা উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করার বিষয়ে ইতিমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) কলেজগুলোর শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে বৈঠক করেছে।
শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সাতটি বড় সরকারি কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নেওয়ার পর আট বছরে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সমস্যাগুলোই পুঞ্জীভূত হয়ে বড় রূপ নিয়েছে। এই আট বছরে সমস্যাগুলো যদি ঠিকমতো সমাধান করা যেত, তাহলে হয়তো এখনকার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতো না। তবে এখন নতুন করে কিছু করার আগে ভবিষ্যৎ প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তা না হলে ভবিষ্যতে আবারও একই ধরনের সমস্যা হতে পারে। আবার এসব কলেজের মধ্যে অধিকাংশেই উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা আছে। এর মধ্যে ঢাকা কলেজের উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার দীর্ঘ ঐতিহ্য আছে। ফলে এসব কলেজের উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।
জানতে চাইলে ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক এস এম এ ফায়েজ আজ প্রথম আলোকে বলেন, এই সাত কলেজের বিষয়ে তাঁরা অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করছেন। এখন এটি আরও ত্বরান্বিত করবেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আনার পর তো দীর্ঘ প্রায় আট বছর হয়ে গেল। তাহলে এই আট বছরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কী করল? বাস্তবতা হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফ থেকে কোনো কোনো ক্ষেত্রে অবহেলা করা হয়েছে।
সাবেক অধ্যক্ষ, ঢাকা কলেজ
একসময় কলেজগুলো মূলত স্বায়ত্তশাসিত বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনেই চলত। কিন্তু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর চাপ কমাতে ১৯৯২ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে কলেজগুলো এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আনা হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠার সময়ে দেশে কলেজের সংখ্যা কম ছিল। পরে কলেজের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। ফলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজগুলোর পড়াশোনার মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বাস্তবতা ও চাহিদার মধ্যে সমন্বয় না করেই দীর্ঘদিন ধরে ঢালাওভাবে দেশের সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন কলেজে স্নাতক (সম্মান) চালু করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ কলেজেই উচ্চশিক্ষায় পড়ানোর মতো পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নেই।
বর্তমানে সারা দেশে অনুমোদিত পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে ১৭৬টি। স্বায়ত্তশাসিত চারটিসহ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ৬১টি (৫৫টি কার্যক্রমে আছে) এবং অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ১১৫টি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন মোট শিক্ষার্থী ৩১ লাখ ৭০ হাজারের বেশি, যা দেশে উচ্চশিক্ষায় মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ৭২ শতাংশ। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজ আছে ২ হাজার ২৫৭টি। এর মধ্যে ৫৫৫টি সরকারি। সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে মোট কলেজের মধ্যে ৮৮১টিতে স্নাতক (সম্মান) পড়ানো হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত রাজধানীর সাত সরকারি কলেজছবি: সংগৃহীত
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা সরকারি কলেজগুলোকে সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়। তারই ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রথম দফায় রাজধানীর সাতটি কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হয়। কলেজগুলো হচ্ছে ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, সরকারি বাঙলা কলেজ ও সরকারি তিতুমীর কলেজ। এসব কলেজে শিক্ষার্থী প্রায় দুই লাখ। শিক্ষক এক হাজারের বেশি।
গত বছরের এপ্রিলে আরও ৯টি সরকারি কলেজকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করার পদক্ষেপ নিয়েছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। অবশ্য রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এখন সেই সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন আটকে গেছে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আসার পর থেকেই এই সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আন্দোলন করছেন। এখন আবারও আন্দোলনে নেমেছেন শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, তাঁরা এখন একধরনের পরিচয়সংকটে ভোগেন।
ঢাকার সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে গবেষণার জন্য বিভাগভিত্তিক গুণগত মানের শিক্ষকের অভাব আছে। আবার শিক্ষার্থী অনুপাতে শিক্ষকসংকট বিরাজ করছে। কয়েক শ শিক্ষার্থীর বিপরীতে ৮ থেকে ৯ জন করে শিক্ষক। কিছু কলেজে বিভাগ অনুযায়ী তা আরও কম। আবার সক্ষমতার বাইরে মাত্রাতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হয়।
অন্যদিকে পরীক্ষা দেরিতে নেওয়া হয়, আবার ফলাফল প্রকাশেও দেরি করার অভিযোগ আছে।
ঢাকা কলেজ প্রাঙ্গণে সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের সংবাদ সম্মেলন। ২৭ জানুয়ারি
শিক্ষার্থীরা বলছেন, তাঁরা একাডেমিক পড়াশোনার পর্যাপ্ত সুযোগ পাচ্ছেন না। শ্রেণিকক্ষের সংকটসহ অন্যান্য সংকট রয়েছে। বিজ্ঞান বিভাগের ল্যাবগুলোয় প্রয়োজনীয় উপকরণ নেই। ভালো মানের লাইব্রেরি কম। আবার কখনো কখনো সম্পূর্ণ পাঠ্যসূচি শেষ না করেই পরীক্ষা শেষ করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেমিস্টার–পদ্ধতি থাকলেও এই সাত কলেজে আবার বর্ষভিত্তিক ফলাফল প্রকাশ করা হয়।
অবশ্য সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আগের চেয়ে পড়াশোনার ক্ষেত্রে কিছু কিছু বিষয়ে অগ্রগতিও হয়েছে। বিশেষ করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকার সময়ে যেখানে যেনতেন ক্লাস করলেও পরীক্ষা দেওয়া যেত, সেখানে এখন পরীক্ষার জন্য নির্ধারিতসংখ্যক ক্লাসের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। যদিও ‘নানা কারণে’ এ ক্ষেত্রে কলেজগুলো ছাড় দেয়। আবার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কলেজগুলোতে ভর্তি পরীক্ষা ছাড়াই কেবল এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হলেও এই সাত কলেজে ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। ফলে এসব কলেজে একপ্রকার বাছাই করে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হচ্ছে। ফলে তুলনামূলক মেধাবীরা এখানে ভর্তি হতে পারছেন।
তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আসার পর থেকেই এই সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আন্দোলন করছেন। এখন আবারও আন্দোলনে নেমেছেন শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, তাঁরা এখন একধরনের পরিচয়সংকটে ভোগেন।
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের অন্যতম ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী আবদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করে, সেখানে আর সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা নিরাপদ নয়। তাই এই সাত কলেজের জন্য স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় করতে হবে। সেই বিশ্ববিদ্যালয় কবে হবে, সেই ঘোষণার আগপর্যন্ত অন্তর্বর্তী প্রশাসন দিয়ে এই সাত কলেজ চালাতে হবে, সেখানে আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেউ থাকতে পারবেন না।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার প্রথমে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সাত কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত রেখে সেগুলো দেখভালে বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেই পুরোপুরি আলাদা ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল। তবে শিক্ষার্থীরা তা মানেননি। এ অবস্থায় এসব কলেজের জন্য আলাদা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান করার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে সরকার। সরকারের পক্ষে এ নিয়ে ইউজিসি কাজ করছে।
এসব কলেজের মধ্যে অধিকাংশেই উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা আছে। এর মধ্যে ঢাকা কলেজের উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার দীর্ঘ ঐতিহ্য আছে। ফলে এসব কলেজের উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
সাত কলেজের একটি ঢাকা কলেজ। এই কলেজের সাবেক এক অধ্যক্ষ আজ প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘এখন দেখা যাচ্ছে, কার সময়ে এই সাত কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আনা হচ্ছে, সেটি নিয়ে অনেক বেশি আলোচনা-সমালোচনা করছেন। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আনার পর তো দীর্ঘ প্রায় আট বছর হয়ে গেল। তাহলে এই আট বছরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কী করল? বাস্তবতা হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফ থেকে কোনো কোনো ক্ষেত্রে অবহেলা করা হয়েছে। কখনো কখনো তুচ্ছতাচ্ছিল্যও করা হয়েছে। তিনি অধ্যক্ষ থাকার সময়ে আলোচনা হয়েছিল এই সাত কলেজের দেখভালে একজন সহ–উপাচার্য থাকবেন, সুনির্দিষ্ট অফিস থাকবে, কিন্তু সেগুলো ঠিকমতো হয়নি। আসলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অভ্যন্তরীণ কিছু কারণে সমস্যাগুলোর সমাধান হয়নি। অবস্থাটি এমন হয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই সাত কলেজকে রেখে সমস্যাগুলো ঠিকমতো সমাধানও করছে না, আবার ছাড়ছেও না।